বাকি সক্ষমতা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রিড অবকাঠামো ও কয়লা আমদানির দরপত্র জটিলতায় ব্যবহার করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর বড় চাপ তৈরি হবে। লোডশেডিং মোকাবেলায় বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা গেলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার ৮ মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এ চাহিদা পূরণ করতে হলে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবগুলোই ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এগুলো সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যায় না। আরএনপিএলের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (১৩০ মেগাওয়াট) বন্ধ রয়েছে। এটাও চলতি মাসের ২৫-২৬ তারিখ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০ মার্চ কেন্দ্রটির জন্য কয়লাবাহী কার্গো আসবে।’
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু থাকবে এমন পরিকল্পনা থেকে সেগুলো নির্মাণ করা হয়। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নির্ধারিত সময়ে চুক্তি করতে না পারায় দীর্ঘসময় ধরে সেগুলো বসিয়ে রাখতে হয়েছে। আবার জ্বালানি সংকট, বিল বকেয়া এমনকি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অনেক কেন্দ্র অলস বসে থেকেছে। কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে এমন পরিস্থিতিতে ভুগছে বিপিডিবি।
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উৎপাদন নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকটে রয়েছে পটুয়াখালীতে চীনা বিনিয়োগে নির্মিত আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দফায় দফায় কেন্দ্রটির কয়লা আমদানির দরপত্র আহ্বান করেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো কয়লা সরবরাহকারী নির্বাচন করা যায়নি। এতে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং ঋণ পরিশোধেও বড় চাপ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে চিঠি দিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। ওই চিঠিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সিওডি বিলম্বিত হওয়া ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চীনা ব্যাংকটি।
আরএনপিএলের এক চিঠি সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ ১৯২ মিলিয়ন ডলার বকেয়া পড়েছে বিপিডিবির কাছে। এ অর্থ পেতে আরএনপিএল কর্তৃপক্ষও উদ্বেগে রয়েছে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু না হলে চলতি মাসে ঋণ পরিশোধের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব নয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি এক্সিম ব্যাংকের ডিভিশন চিফের কাছে এ চিঠি পাঠান আরএনপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ। ওই চিঠিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নেয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড আরো এক বছর বাড়ানোর কথা বলা হয়।
আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা আমদানির জন্য ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রথমবার দরপত্র ডাকা হয়। তবে দরপত্রে বেশকিছু শর্তের পরিবর্তনের কারণে পরে তা বাতিল হয়। এর পর ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে পাঁচটি কোম্পানি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইয়াংথাই এনার্জি কারিগরিভাবে যোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু ওই বছরের ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দরপত্রটি বাতিল করে দেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করে। পরে সেটিও বাতিল হয়। চতুর্থ দফায় দরপত্রে কারিগরি ও আর্থিকভাবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইয়াংথাই এনার্জি পুনরায় নির্বাচিত হলেও তা নানা কারণ দেখিয়ে বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয় আরএনপিএল। যদিও চতুর্থ দফায় ডাকা দরপত্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এক বছর মেয়াদি কয়লা সরবরাহের জন্য ইন্দোনেশিয়ান কোম্পানি পিটি সাম্বার এনার্জি টিবেকির সঙ্গে চুক্তি সই করে আরএনপিএল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি এ চুক্তি সই হয়।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লাসংক্রান্ত দরপত্র জটিলতা, বকেয়া এবং কেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ঠিক না থাকায় নানা সময়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সরকার। এ পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ সময়েও ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কোনো অগ্রগতি হয়নি। যে কারণে কেন্দ্রগুলো থেকে আর্থিক সুফলের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
আরএনপিএলের কয়লা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আরপিসিএল-নরিনকো কেন্দ্রটির জন্য একটি তিন মাস মেয়াদি চুক্তি করেছে। ওই কোম্পানি একটি কয়লা সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে। তবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু থাকলেও এইচএফও থেকে বড় সাপোর্ট নিতে হবে।’
দেশে কয়লাভিত্তিক সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেশির ভাগ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত কয়লা মজুদ থাকলেও সব কেন্দ্র সার্বক্ষণিক ব্যবহার করা যাবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষত রক্ষণাবেক্ষণ, তীব্র বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি ও বকেয়াসংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হলে তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
বিপিডিবির ফেব্রুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পটুয়াখালীর বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৭৬ দিনের কয়লা মজুদ রয়েছে। বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা মজুদ রয়েছে ৩৩ দিনের। মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা মজুদ রয়েছে ২৫ দিনের, চট্টগ্রামের বাঁশখালী এসএস পাওয়ার কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মজুদ রয়েছে ২৩ দিনের, বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মজুদ রয়েছে ৩৬ দিনের, পটুয়াখালীর আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা মজুদ সাতদিনের। আর বড়পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মজুদ রয়েছে ২২২ দিনের।
দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় লোডশেডিং এড়ানোর জন্য নির্বাচিত সরকার এরই মধ্যে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। কীভাবে জ্বালানির সংকট বিবেচনায় নিয়ে আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়টি নিয়েও কাজ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সব বিষয়ে কাজ করছি। বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের সঙ্গে বসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি। আপৎকালীন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়া যায় সে বিষয়গুলো নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে।’
দেশে গ্যাস খাতে বিদ্যমান সংকট মোকাবেলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে কিনা এমন বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। কারণ সব সংস্থার সঙ্গে বসে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।’